ARTICLE AD BOX
ভাইরা চক্রান্ত করে শিশু ইউসুফকে (আ.) কূপে ফেলে দেওয়ার পর একদল ব্যবসায়ী কূপ থেকে তাকে উদ্ধার করে এবং দাস হিসেবে মিশরে বিক্রি করে দেয়। তাকে কিনে নেন তৎকালীন আজিজে মিশর। মিশরের তৎকালীন শাসনব্যবস্থায় আজিজ ছিলেন বাদশাহর পর সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তি। বাদশাহ ছিলেন মিশরের সর্বময় ক্ষমতার মূল মালিক আর শাসন পরিচালনার দায়িত্ব ছিল আজিজে মিশরের ওপর।
ইউসুফ (আ.) আজিজে মিশরের বাড়িতে বেড়ে ওঠেন। তিনি যখন যৌবনে পদার্পণ করেন, তখন আজিজের স্ত্রী জুলেখা তার প্রতি আসক্ত হন এবং তার সঙ্গে যৌনসম্পর্ক করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ইউসুফ (আ.) আল্লাহ তাআলার সাহায্যে তার প্ররোচনা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে জুলেখার চক্রান্তে ইউসুফ (আ.) কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন এবং বেশ কয়েক বছর কারাগারে কাটান।
তারপর আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় মিশরের বাদশাহ একটি স্বপ্ন দেখেন। মিশরের স্বপ্ন-বিশারদরা ওই স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হন। কারাগারে থাকা ইউসুফ (আ.) স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যা করে বাদশাহর নজরে আসেন। বাদশাহ তদন্ত করে জানতে পারেন তিনি চক্রান্তের শিকার হয়ে কারাগারে আছেন। জুলেখা স্বীকার করেন, ইউসুফের কোনো দোষ ছিল না, বরং তিনিই তাকে অনৈতিক সম্পর্কে জড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, বাদশাহ বলল, তোমরা যখন ইউসুফকে কুপ্ররোচনা দিয়েছিলে তখন তোমাদের কী হয়েছিল? তারা বলল, মহিমা আল্লাহর! আমরা তার ব্যাপারে খারাপ কিছু জানি না। আজিজের স্ত্রী বলল, এখন সত্য প্রকাশ পেয়েছে, আমিই তাকে কুপ্ররোচনা দিয়েছি। আর নিশ্চয় সে সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। (সুরা ইউসুফ: ৫১)
বাদশাহ ইউসুফকে (আ.) কারাগার থেকে মুক্ত করে নিজের সহচর বানাতে চান। বাদশাহর আগ্রহে সাড়া দিয়ে ইউসুফ (আ.) মিশরের শস্যভাণ্ডারের দায়িত্ব চান। বাদশাহ তাকে ওই দায়িত্ব দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, বাদশাহ বলল, তোমরা তাকে আমার নিকট নিয়ে এস, আমি তাকে নিজের জন্য আপন করে নেব। তারপর যখন সে তার সাথে কথা বলল, তখন বলল, নিশ্চয় আজ তুমি আমাদের নিকট মর্যাদাবান ও আস্থাভাজন। সে (ইউসুফ) বলল, আমাকে শস্যভাণ্ডারের দায়িত্ব দিন, নিশ্চয় আমি যথাযথ হেফাযতকারী, সুবিজ্ঞ। আর এভাবে আমি ইউসুফকে জমিনে কর্তৃত্ব প্রদান করেছি, সে যেখানে ইচ্ছা স্থান করে নিতে পারত।। আমি যাকে ইচ্ছা রহমত দান করি, আর আমি সৎকর্মশীলদের প্রতিদান বিনষ্ট করি না। (সুরা ইউসুফ: ৫৪-৫৬)
ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.) এই আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় লিখেছেন, ইউসুফ (আ.) নিজের দক্ষতার ওপর ভরসা রেখে এবং মানুষের সার্বিক কল্যাণের স্বার্থে দায়িত্ব চেয়ে নিয়েছিলেন। তিনি মিশরের শস্যভাণ্ডারের দায়িত্ব তাকে দেওয়ার অনুরোধ জানান। এই শস্যভাণ্ডার ছিল সেইসব পিরামিডসমূহ যেখানে আগামী বছরগুলোর জন্য শস্য সংগ্রহ করে রাখা হতো। ইউসুফের (আ.) বিশ্বাস ছিল যে তিনি সবচেয়ে নিরাপদ ও সুসংহত উপায়ে তা বণ্টন ও পরিচালনা করতে পারবেন। বাদশাহ ইউসুফের (আ.) এই অনুরোধ গ্রহণ করেছিলেন—হয়তো তার প্রতি অনুরাগের কারণে, কিংবা তাকে সম্মানিত ও পুরস্কৃত করার উদ্দেশ্যে। (তাফসিরে ইবনে কাসীর)
অর্থাৎ কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে প্রথমত ইউসুফ (আ.) মিশরের শস্যভাণ্ডারের দায়িত্বশীল বা খাদ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন, আজিজ বা বাদশাহ নন।
পরবর্তীতে ইউসুফ (আ.) আজিজে মিশর বা মিসরের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক প্রধানের মর্যাদায় উন্নীত হন। কোরআনের বর্ণনায় এসেছে, ইউসুফের ভাইরা মিশরে এসে ইউসুফকে ‘আজিজ’ বলে সম্বোধন করেছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন, তারা (ইউসুফের ভাইরা ইউসুফকে লক্ষ করে) বলল, হে আজিজ, তার পিতা একবারেই বৃদ্ধ, আপনি তার স্থলে আমাদের একজনকে নিন, আমরা তো আপনাকে দেখছি সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত। (সুরা ইউসুফ: ৭৮)
ইমাম কুরতুবী (রহ.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, তারা ইউসুফকে (আ.) ‘আজিজ’ বলে সম্বোধন করেছিল, কারণ ততদিনে পূর্ববর্তী আজিজের বরখাস্ত অথবা মৃত্যুর পর তিনি মিশরের 'আজিজ' পদে আসীন ছিলেন। (তাফসিরে কুরতুবী)
সুতরাং পবিত্র কোরআনের বর্ণনা থেকে আমরা জানতে পারি, ইউসুফ (আ.) প্রথম পর্যায়ে মিশরের খাদ্যমন্ত্রী, পরবর্তীতে আজিজে মিশর হয়েছিলেন। তবে তিনি কখনও মিশরের বাদশাহ ছিলেন না।
কিছু ইসরাইলি বর্ণনায় এসেছে, বাদশাহ ইউসুফের (আ.) হাতে মুসলমান হয়েছিলেন এবং ইউসুফকে পুরো মিশরের শাসন ক্ষমতা অর্পণ করে বলেছিলেন, ‘আমি আপনার চাইতে বড় নই, কেবল সিংহাসনে বসা ছাড়া’। কিন্তু কোরআনে বা নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত কোনো হাদিসে এ রকম কিছু পাওয়া যায় না। তাই নিশ্চিতভাবে জানি না এ রকম ঘটনা আসলেই ঘটেছিল কি না।
ইসরাইলি বর্ণনা অর্থাৎ ইহুদি বা খৃষ্টানদের ধর্মীয় সূত্র থেকে পাওয়া কোনো ঘটনা নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করার উপায় নেই যেহেতু তাদের কাছে সংরক্ষিত আসমানি কিতাবসহ ধর্মীয় কোনো উৎসই নির্ভরযোগ্য নয়; এগুলোতে মানুষের বানানো বহু কাহিনি ও বিবরণ ঢুকে গেছে।
ওএফএফ








English (US) ·